Thu. Oct 28th, 2021
YMC

গতপর্বে অনিশ্চয়তা নীতির ইতিহাস সম্পর্কে আলোচনা করেছি এখন অনিশ্চিয়ত নীতির ব্যাখ্য।

1

সিফাত নামের কোনো এক বালক মার্বেল খেলতে ভালোবাসে । তার হাতে ছোট থেকে বড় নানান সাইজের মার্বেল আছে । হঠাৎ তার মনে প্রশ্ন জেগে উঠলো , অন্ধ মানুষরা কিভাবে বুঝে সামনে কিছু আছে কিনা ? সে ভাবলো বাদুড় তো দিনের বেলা দেখে না । তাহলে কি রাতে দেখে ? সিফাত চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো, না , এই হতে পারে না । আলো ছাড়া কোনো ভাবে দেখা যাবে না । পিছনে ফিজিক্স জানতে হবে । যদি আলো ছাড়া দেখা যেতো তাহলে বিজ্ঞানীরা দ্বিচীর পরীক্ষায় গোয়েন্দা হিসেবে বাদুরকে ব্যবহার করতো । অনেক খুঁজা খুঁজির পর সে জানতে পারলো বাদুরের দেখার কারণ । বাদুড় যখন চলে তখন উচ্চ কম্পাংকের শব্দ সৃষ্টি করে চলে । আর  শব্দ প্রতিফলিত হওয়ার কারণে বাদুড় বুঝতে পারে সামনে কোনো বস্তু আছে কীনা ! 

সিফাত ভাবলো   একটা পরীক্ষা করে নতুন অভিজ্ঞতা নিলে ভালো হবে ! ঘরের লাইট বন্ধ করলো । সাথে একটা বক্স নিলো বক্সের ভিতরে একটা মাঝারি সাইজের মার্বেল রাখলো । লাইট অফ এই মুহূর্তে বক্সের ভিতরে মার্বেল কোথায় আছে সেটা সিফাত জানে না । এখন সিফাত ভাবলো মার্বেল কোথায় আছে তা বের করার জন্য অন্য মারবেল ছুড়ে মারলে জানা যাবে । ব্যাপারটা কেমন ? যখন বাইরে থেকে মার্বেল বাক্সের ভিতর ছুড়ে মারলে যদি শব্দ পাওয়া যায় তাহলে বক্সের ভিতরে মার্বেলের অবস্থান জানা যাবে । ঠিক বাদুরের বস্তুর শনাক্তের ভূমিকার মতো । সিফাত বাক্সের ভিতরে প্রথম ছোট ছোট মার্বেল নিক্ষেপ করলো । ছোট মার্বেলের ফলে শব্দ আস্তে শোনা যাচ্ছিলো যার ফলে অবস্থান বের করা কঠিন হয়ে পরলো  ।  তাই পরবর্তীতে বড় মার্বেল ছুড়লো এবার শব্দ স্পষ্টভাবে শোনা যাচ্ছিল । সিফাত নিশ্চিত হলো মার্বেল এর অবস্থান x=2 ও y=3 মিটার বিন্দুতে রয়েছে । (2 ,3 ) বিন্দু বরাবর পরবর্তীতে আরেকটি মার্বেল ছুড়ে মেরে দেখলো (2 ,3 ) বিন্দুতে কোনো মার্বেল নেই । অন্ধদের জীবন যে কত কষ্টের সিফাত বুঝতে পারলো । 

মার্বেলের সাইজ বাড়ানো হলে মার্বেলের ভর বা ভরবেগ বৃদ্ধি পাবে । ছোট মার্বেল বাক্সে থাকা।  মার্বেলের গতির চেঞ্জ করতে সহজে পারে না । ছোট মার্বেলের বেলা ভরবেগ  নিশ্চিত ভাবে জানা গিয়েছিল ( যেহেতু ছোট মার্বেল ভরবেগ সহজে চেঞ্জ করতে পারেনি সেহেতু ভরবেগ আগেরটা থাকবে ) ।   ভরবেগ নিশ্চিত কিন্তু অবস্থান অনিশ্চিত । মার্বেলের সাইজ বৃদ্ধি করলে বক্সে থাকা মার্বেলের অবস্থান তখন নিশ্চিত কিন্তু ভরবেগ অনিশ্চিত । কারণ বড় মার্বেলটা বাক্সের মার্বেলের ধাক্কা মেরে ভরবেগের  বারোটা বাজিয়ে দিবে ।

3

আইনস্টাইন অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে ছিলেন কিন্তু তার আবিষ্কার তড়িৎ ক্রিয়া অনিশ্চতার পক্ষে স্লোগান দিচ্ছিলো । তড়িৎ ক্রিয়া বাখ্যা ও কোয়ান্টাম তত্ব পর্বে দেখেছি আইনস্টাইন আলোকে কনা ধরে তড়িৎ ক্রিয়ার ব্যাখ্যা দেন   । ইলেকট্রনের উপর আলো ফেললে ধাতু থেকে ইলেকট্রন বের হবে এবং গতিশক্তি লাভ করবে ।  যত বেশি শক্তি ( আলোর কম্পাঙ্ক ) বাড়ানো হবে ইলেকট্রনের গতিশক্তি ততো বেশি বৃদ্ধি পাবে  এবং যত বেশি কম্পাঙ্ক হবে তরঙ্গদৈর্ঘ্য তত ক্ষুদ্র হবে । 

আলোক বিজ্ঞানের ইতিহাসে আল হাজেন পর্বে দেখেছি কোন বস্তু দেখতে হলে ঐই বস্তু থেকে আলো এসে চোখে পড়তে হবে । এটা আবিষ্কার করেন আল হাজেন । এখন আমাদের কাজ হলো ইলেকট্রনের উপর আলো ফেলে ইলেকট্রনের অবস্থান ও ভরবেগ নির্ণয় করা । ইলেকট্রনের অবস্থান নির্ণয় করতে হলে আমাদেরকে  ইলেকট্রনের উপর আলো ফেলতে হবে । ইলেকট্রনকে একটি মার্বেল হিসেবে কল্পনা করি এবং আলোর ফোটনকে আরো একটি মার্বেল কল্পনা করি । কিছুক্ষণ আগে আমরা দেখেছিলাম সিফাত যেভাবে মার্বেল দিয়ে মার্বেল শনাক্ত করেছিল ঠিক তেমন ঘটনা ঘটবে এবারো । আলো হচ্ছে মূলত ফোটন কণা । তার ফোটন কণা হালকা-পাতলা ইলেকট্রন কে আঘাত করতে পারবে ইলেকট্রনের ভরবেগ এবং অবস্থানকে আঘাত করে বারোটা বাজিয়ে দিবে । ফোটনের শক্তি যত বাড়বে ইলেকট্রনকে ততো জোরে আঘাত করে ইলেকট্রনের ভরবেগের বারোটা বাজাবে । ইলেকট্রনের অবস্থান নির্ণয় করার জন্য ইলেকট্রনের উপর কম তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের আলো ফেলতে হবে । লাল আলো ইলেকট্রনকে শনাক্ত করতে পারে না অর্থাৎ লাল আলো ইলেকট্রনের অবস্থান নিখুঁত ভাবে নির্ণয় করতে পারে না । আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য যত কম হবে তত নিখুত ভাবে ইলেকট্রনের অবস্থান নির্ণয় করা যাবে । বেগুনি থেকে অতিবেগুনি আলোকরশ্মি দিয়ে ইলেকট্রনের অবস্থান নির্ণয় করা সম্ভব । তরঙ্গ দৈর্ঘ্য কমানোর অর্থ হলো কম্পাঙ্ক বাড়ানো যার ফলে ফোটনের শক্তি বেড়ে যাবে । ফোটনের শক্তি তখন ইলেকট্রনের ভরবেগ পরিবর্তন করে দিবে । 

আমরা বড় তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের আলো দিয়ে ইলেকট্রনের অবস্থান নির্ণয় করতে পারবো না । এক্ষেত্রে অবস্থান অনিশ্চিত কিন্তু তখন ভরবেগ নিশ্চিত । আবার কম তরঙ্গের আলো অবস্থান নির্ণয় করতে পারলেও ইলেকট্রনের ভরবেগ পরিবর্তন করে দিবে।  ফলে অবস্থান নিশ্চিত কিন্তু ভরবেগ অনিশ্চিত হয়ে যাবে । সিফাত এর মার্বেল দিয়ে বক্সের মার্বেল শনাক্ত করার মতো । ছোট ছোট মার্বেল দিয়ে অবস্থান নির্ণয় করা না গেলেও ভরবেগ নির্ণয় করা যায় আবার বড়-বড় মার্বেল দিয়ে অবস্থান নির্ণয় করা গেলেও ভরবেগ নির্ণয় করা যায় না । ঠিক তেমনি ছোট ছোট কম্পাঙ্কের ফোটন দিয়ে ভরবেগ মাপা গেলে অবস্থান মাপা যায় না । তখন অবস্থান অনিশ্চিত । আবার বড় বড় কম্পাঙ্কের ফোটন দিয়ে অবস্থান নির্ণয় করা গেলে ভরবেগ নিখুঁত ভাবে মাপা যায় না । তখন ভরবেগ অনিশ্চিত ।

4

সমস্যা হলো আইনস্টাইনকে নিয়ে , কিছুতেই আইনস্টাইন অনিশ্চয়তা নীতিকে মানবে না । বোর আর আইনস্টান আজীবন এই জিনিস নিয়ে বিতর্ক করেছে । আইনস্টাইন বলতো , ” নিশ্চয়ই ঈশ্বর পাশা খেলা না ” । বোর পাল্টা জবাব দিতো । বোরের জবাবে ,” মিস্টার আইনস্টাইন ঈশ্বর কী করবেন না করবেন সেটা আপনাকে বলে করবেন না ” 

আইনস্টাইন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলতো ” বিজ্ঞান এতই অনিশ্চিত হবে তাহলে আর বিজ্ঞানী হতাম না , সরাইখানার বাবুর্চি অথবা মুচি হতাম । 

বোর পাল্টা জবাব দিয়ে বলে ” এখনো সে সময় ফুরিয়ে যায়নি আইনস্টাইন ”  তাদের এই বিতর্ক আজীবন ছিলো । 

বোর এবং আইনস্টান রাস্তা দিয়ে একদিন হাটার সময় কথা বলতে বলতে যাচ্ছিলো । হঠাৎ করে একটা গাড়ি আইনস্টাইনের পাশ কাটিয়ে চলে গেল । বোর তখন আইনস্টাইনকে বিপদ থেকে সরিয়ে নিলো । আইনস্টাইন একটু হেসে বলল ” গাড়ি আমাকে কিছুই করতে পারতো না  । কারণ আমি গাড়ির ভরবেগ নিশ্চিতভাবে জানি তাই গাড়ির অবস্থান অনিশ্চিত । গাড়িটা হয়তো আমার সামনে ছিল না । ” 

বোর আইনস্টাইনকে বোঝাতে লাগলো কোয়ান্টাম জগতে এই ঘটনা ঘটবে কিন্তু বাস্তব জগতে এই ঘটনা ঘটবে না ।

আচ্ছা বাস্তব জগতে ঘটবে না কেন ? 

বোর আইনস্টাইনকে বললো অনিশ্চয়তায় বাস্তব জীবনে ঘটে কিন্তু খুব সামান্য । 

      ∆x∆p =h/4π 

ধরি , গাড়িতে ভরবেগ p=1000 kgm/s 

এখন বাস্তব জগতে গাড়িটা অবস্থানের অনিশ্চয়তায় ,

∆x =h/1000 

=10^-39 m 

গাড়িটার অনিশ্চয়তা পরিমাপ ∆x = 10^-39 m । এত বড় গাড়ির জন্য সামান্য এতোটুকু অনিশ্চয়তা কোনো প্রভাব ফেলবে না । 

প্লাঙ্কের ধ্রুবকের মান h=6.62×10^-36 j/s যার কারণে বাস্তব জীবনে কোনো প্রভাব ফেলে না । যদি প্লাঙ্কের ধ্রুবকের মান খুব বেশী বড় হতো তাহলে কি হতো ? 

এবার প্লাঙ্কের ধ্রুবকের মান বড় ধরে হিসাব করে দেখি কি হয় ?

ধরি

h=10^36 j/s 

∆x=10^36/1000

  ∆x=10^33 m 

যদি প্লাঙ্কের ধ্রুবকের মান h = 10^36 j /s হতো তাহলে গাড়ির অবস্থানের অনিশ্চতার মান ∆ = 10^33 m হতো । আমাদের জবনকে বাস্তব জীবনকে উলট – পালট করে দিতো । বোরের সাথে রাস্তায় হাটার সময় আইনস্টান যা বলেছে তা সত্য পরিণত হতো । আমরা গাড়ির ভরবেগ জানি তাই গাড়ির অবস্থান সম্পর্কে কোনো কিছু নিশ্চিতভাবে জানতাম না । গাড়ির অবস্থান জানলে গাড়ির ভরবেগ অনিশ্চিত হয়ে যেতো ।আপনি নিশ্চিত ভাবে গাড়ির অবস্থান নির্ণয় করলেন মনে করুন গাড়ি সাভার বাস স্থানে দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু আপনি জানেন না গাড়ির ভরবেগ কি ! আপনি গাড়িতে উঠার জন্য পা বাঁড়ালেন ঠিক ওই মুহূর্তে গাড়ির ভরবেগ শূন্য নাও হতে পারে তখন কি হবে ? তখন কি আর হবে গাড়ির আঘাতে সোজা উপরে যেতে হবে ! 

আমি তো ভাবতেছি অন্য কিছু । যদি প্লাঙ্কের ধ্রুবকের মান h= 10^36 হতো তাহলে আমাদের অন্ধকার জীবনে বসবাস করতে হতো । 

আলোর কম্পাঙ্ক f= 10^14 Hz 

ফোটনের শক্তি E = hf 

                         = 10^36 × 10^14 

                         = 10^50 j 

h = 10^36 হলে আলোর ফোটনের শক্তি হতো 10^50 j । ভাবা যায় ! h= 1 j/s হলেও ফোটনের শক্তি E=10^14 j হতো । এত বিপুল পরিমান শক্তি মানুষের জন্য অকল্পনীয় যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়াবে । আপনি ঘর থেকে বের হয়ে সূর্যের আলোতে আসলে সূর্য থেকে বিশাল পরিমাণ শক্তির ফোটন আপনার শরীরে আঘাত করে তছনছ করে দিবে । তখন লাইটের আলো বা ক্যামেরার ফ্লাশ দিয়ে আপনার ছবি তুলতে চাইতেন না । পরের আলো ( সূর্যের আলো ) দিয়ে নিজেকে সুন্দর বলে দাবি যারা করে অহংকার করেন সেটাও পারতেন না ।

4

এতক্ষণ যা বললাম ” ভরবেগ ও অবস্থানের অনিশ্চয়তার ‘ কারণ হিসাবে ফোটন কণার ভূমিকা রয়েছে । এগুলা সব পরীক্ষাগারে দেখা ফলাফল । এখন বলবো থিওরিক্যাল পদার্থ বিজ্ঞানের মতে অনিশ্চয়তা নীতি । 

দ্য ব্রগলি এর কণা – তরঙ্গ দ্বৈত নীতি থেকে হাইজেনবার্গের সূত্র ব্যাখ্যা করা যায় । তার আগে আপনাকে মেনে নিতে হবে কণার তরঙ্গ ধর্ম রয়েছে । কনার সাথে তরঙ্গ রয়েছে । দ্য ব্রগলি সূত্রটা হলো ,

চিত্র 1 নং থেকে আমরা তরঙ্গ নির্ণয় করতে পারি । সুতরাং 1 নং সমীকরণে তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ( lemda ) এর মান বসিয়ে নিখুঁতভাবে ভরবেগ নির্ণয় করতে পারি । এখন প্রশ্ন হলো কনার অবস্থান কোথায় ? আপনি বলবেন A থেকে B বিন্দুর ভিতরে । এখন বস্তুর অবস্থান অনেক জায়গা কিন্তু ভরবেগ নিশ্চিত । আপনি ভরবেগ নিখুঁতভাবে মাপতে গিয়ে তরঙ্গদৈর্ঘ্য নিখুঁতভাবে মেপেছেন তখনি অবস্থান অনিশ্চিত ।

আবার , এখন আপনি ভাবলেন বস্তুর অবস্থান যেভাবে হোক নিখুত ভাবে বের করবেন ।

অবস্থান জানার জন্য আপনি কনার অবস্থান c বিন্দুতে সেটা নিশ্চিত ভাবে মেপেছেন । যদি আপনাকে প্রশ্ন করি কণার ভরবেগ কত ? 

কত আর হবে p=h/λ হবে । কিন্তু এবার তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের মান কত ? এটা আপনি অনিশ্চিত কারণ ক্ষুদ্র c বিন্দুতে তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের মান কত হবে আপনি তা জানেন না । যার ফলে আপনি বস্তুর ভরবেগ নির্ণয় করতে পারবেন না । এখন আপনি বস্তুর অবস্থান নিশ্চিত ভাবে মেপেছেন যার কারণে আপনি বস্তুর অবস্থান অনিশ্চিত করে ফেলেছেন । এটাই হলো অনিশ্চিয়তার ব্যাখ্যা । 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *