পৃথিবীর নিকটতম ব্ল্যাকহোল আসলে একজোড়া নক্ষত্র ছাড়া কিছুই নয়। - YMC
Thu. Jul 7th, 2022
ব্ল্যাকহোল

পৃথিবীর নিকটতম ব্ল্যাকহোল আসলে একজোড়া নক্ষত্র ছাড়া কিছুই নয়, সম্প্রতি জ্যোতির্বিজ্ঞানে ধারণা করেছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানে মানুষের জ্ঞান যতই বৃদ্ধি পাচ্ছে বিজ্ঞানীরা নতুন নতুন ব্ল্যাক হোল খুঁজতে  সেগুলিকে তত বেশি ব্যবহার করছেন ৷ কিন্তু আরও ব্ল্যাক হোল খোঁজার এই যাত্রা কিছু জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের বিপথে নিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে ক্যামব্রিজে হার্ভার্ড স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী করিম এল-বদ্রি বলেছেন , “আপনি বলছেন যে ব্ল্যাক হোলগুলি খড়ের গাদায় সূঁচের মতো, কিন্তু হঠাৎ করে আমাদের আগের চেয়ে অনেক বেশি খড়ের গাদা হয়ে গেছে । আপনার কাছে হয়তো সেগুলি খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তবে আপনার কাছে তাদের মতো দেখতে জিনিসগুলি খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা আরো বেশি রয়েছে।”

নিকটতম ব্ল্যাকহোল

সম্প্রতি আরও দুটি দাবিকৃত ব্ল্যাক হোল পরবর্তীতে পরিণত হয়েছে: অদ্ভুত জিনিসে, যা দেখতে মোটামুটি ব্ল্যাকহোল এর মতোই। এল-বদ্রি এবং তার সহকর্মীরা 24 শে মার্চ রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির মাসিক নোটিশে রিপোর্ট করেছেন, দাবিকৃত ব্ল্যাকহোল দুটি উভয়ই আসলে জোড়া-নক্ষত্র সিস্টেম যা তাদের বিবর্তনের ধারায় আগে কখনো বিজ্ঞানীদের চোখে পড়েনি । গবেষকরা বলছেন,  সিস্টেমগুলি থেকে আসা আলোকে ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে সিস্টেম দুটি কে বোঝা যেতে পারে তারা আসলে কি।  2021 সালের গোড়ার দিকে, ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্বিজ্ঞানী থারিন্দু জয়াসিংহে এবং তার সহকর্মীরা একটি তারার সিস্টেম খুঁজে পাওয়ার কথা জানিয়েছেন – যার নামকরণ করা হয়েছে ইউনিকর্ন ,  যেটা তাদের ধারনা অনুযায়ী  পৃথিবী থেকে প্রায় 1,500 আলোকবর্ষ দূরে একটি অদৃশ্য ব্ল্যাক হোলকে প্রদক্ষিণ করে তার পূর্বের বছরগুলিতে একটি বিশালাকার লাল তারকায় পরিণত হয়েছে। জয়সিংহে সহ একই গবেষকদের মধ্যে কয়েকজন পরে জিরাফ (Giraffe) নামে পরিচিত দ্বিতীয় অনুরূপ নক্ষত্রের কথা জানিয়েছেন, যা প্রায় 12,000 আলোকবর্ষ দূরে পাওয়া গেছে। কিন্তু এল-বাদরি সহ অন্যান্য গবেষকরা নিশ্চিত ছিলেন না যে তরকাগুলি ব্ল্যাক হোলকে আশ্রয় করে হয়েছে । তাই জয়াসিংহে , এল-বাদরি এবং অন্যান্যরা তথ্য পুনঃবিশ্লেষণের জন্য যৌথ বাহিনী গঠন করেন । প্রতিটি তারার সিস্টেমের প্রকৃতি যাচাই করার জন্য, গবেষকরা নক্ষত্রের আলোক বর্ণালীকে রংধনুতে পরিণত করেন  । রংধনুগুলি উত্পাদিত হয় যখন তারার আলোর উপাদান প্রিজমের মাধ্যমে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে বিভক্ত হয়। যেকোন নক্ষত্রের বর্ণালীতে রেখা থাকে । রেখাগুলোতে থাকা তারার পরমাণুগুলি আলোর নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষণ করে। একটি ধীর-ঘূর্ণায়মান তারার বর্ণালী রেখা খুব তীক্ষ্ণ থাকে, কিন্তু একটি দ্রুত-ঘূর্ণায়মান তারার একটি অস্পষ্ট এবং দাগযুক্ত বর্ণালী রেখা থাকে।

এল-বদ্রি বলেছেন, “যদি তারা যথেষ্ট দ্রুত ঘোরে, তাহলে সমস্ত বর্ণালী গুলো প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়”। তিনি আরও যোগ করেন, “সাধারণত, একটি নক্ষত্রে বর্ণালী রেখার মধ্যে অন্য আরো একটি বর্ণালী রেখার সেট সন্ধান করে একটি বর্ণালীতে দ্বিতীয় আরেকটি তারকা সনাক্ত করা হয়, এবং এটি করা কঠিন যদি একটি তারকা দ্রুত ঘূর্ণায়মান হয়।”এই কারণেই জয়সিংহে এবং সহকর্মীরা প্রাথমিকভাবে এই প্রতিটি সিস্টেমকে ভুল বুঝেছিলেন। জার্মানির গার্চিং-এর ইউরোপীয় সাউদার্ন অবজারভেটরির জ্যোতির্পদার্থবিদ জুলিয়া বোডেনস্টাইনার (তিনি পরবর্তীতে নতুন গবেষণায় জড়িত ছিলেন না) বলেছেন, “সমস্যাটি ছিল যে শুধুমাত্র একটি তারা ছিল না, তার সাথে দ্বিতীয় আরেকটি তারা ছিল যেটি মূলত লুকিয়ে ছিল”।  প্রতিটি সিস্টেমের সেই দ্বিতীয় তারাটি খুব দ্রুত ঘোরে, যার কারণে তাদের বর্ণালীকে দেখা দুরূহ হয়ে পড়ে। এল-বদ্রি বলেছেন, কোনো কিছুকে প্রদক্ষিণ করলে একটি নক্ষত্রের বর্ণালীর রেখাগুলি সামনে পিছনে সরে যাবে । তাই যদি কেউ মনে করে যে একটি কক্ষপথে গড়ে মাত্র একটি , ধীর গতিতে ঘূর্ণায়মান নক্ষত্র আছে (যা এই সিস্টেমগুলিতে প্রথম নজরে মনে হয়েছিল ) এবং তারাটি একটি অদৃশ্য ব্ল্যাকহোলকে প্রদক্ষিণ করে ঘুরছে তাহলে সে ভুল ভাবছে ।

আরো পড়ুন :

চাঁদে মানুষ বসতি স্থাপন করতে পারে না কেন ?

গবেষকরা ডেটা পুনরায় বিশ্লেষণ করার পরে খুঁজে পেয়েছেন , ইউনিকর্ন এবং জিরাফ প্রত্যেকে দুটি নক্ষত্র ধারণ করে, যা নাক্ষত্রিক বিবর্তনের আগে কখনও দেখা যায় নি এমন পর্যায়ে ধরা পড়ে। উভয় সিস্টেমেই একটি পুরানো বিশালাকার লাল  তারকা রয়েছে যার সাথে রয়েছে স্ফীত  এবং মাঝারি আকারের আরো একটি তারা যা জীবনের শেষ পর্যায়ে যাওয়ার পথে।  মাঝারি আকারের তারকা গুলো তাদের সাথে থাকা  বিশালাকার লাল তারকা গুলোর এত কাছাকাছি থাকে যে তারা মহাকর্ষীয় ভাবে বিশালাকায় তারকা থেকে তাদের উপাদান চুরি করে।  এল-বদ্রি বলেছেন, এই মাঝারি আকারের তারকা গুলো আরও বেশি ভর জমা করে এবং তারা দ্রুত ঘোরে,  ফলে তাদের প্রাথমিকভাবে সনাক্ত করা যায় না। দেখে মনে হয় আসলে একটি তারা ঘুরছে এবং তারাটি কোনো ব্ল্যাক হোল কে কেন্দ্র করে ঘুরছে।

বোডেনস্টাইনার বলেছেন, “প্রত্যেকে সত্যিই আকর্ষণীয় ব্ল্যাক হোল খুঁজছিল, কিন্তু তারা যা পেয়েছিল তা সত্যিই আকর্ষণীয় এক নক্ষত্রজোড়া “।

এগুলিই একমাত্র সিস্টেম নয় যার মাধ্যমে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রতারিত হয়েছে ৷ সম্প্রতি যাকে পৃথিবীর নিকটতম ব্ল্যাকহোল বলে মনে করা হয়েছিল তাও বিবর্তনের একটি বিরল পর্যায়ে দেখা নক্ষত্রের জোড়া ছাড়া আর কিছু নয় (SN: 3/11/22)। জয়সিংহ বলেছেন,  “অবশ্যই, এটি হতাশাজনক যে আমরা যা  ব্ল্যাক হোল ভেবেছিলাম আসলে তা ব্ল্যাক হোল ছিল না, তবে এটি বিবর্তনের ধারায় ব্ল্যাক হোল প্রক্রিয়ার একটি  অংশ,”। তিনি বলেছেন, তিনি এবং তার সহকর্মীরা এখনও ব্ল্যাক হোল খুঁজছেন, তবে মিথস্ক্রিয়াকারী তারার জোড়া কিভাবে তাদের প্রতারিত করতে পারে সে সম্পর্কে আরও বেশি সচেতনতার সাথে।

রেফারেন্স :

Unicorns and Giraffes in the binary zoo: stripped giants with subgiant companions

Leave a Reply

Your email address will not be published.