Thu. Sep 23rd, 2021
YMC

শক্তির একটা নীতি আছে । শক্তি কখনো ধ্বংস বা সৃষ্টি হয় না । শক্তি এক রূপ থেকে অন্য রূপে রূপান্তরিত হয় হোক সেটা গতি শক্তি বা তাপ শক্তি । শক্তি ধ্বংস না হলে এক রূপ থেকে অন্য রূপে রূপান্তর হতে হবে । আর গতি শক্তি বা অন্য যে কোনো শক্তি ভগ্নাংশ হতে পারে  অর্থাৎ প্রকৃতিতে শক্তি যাচ্ছে তাচ্ছে মান হতে পারে । আমরা সবাই জানি , আলো এক প্রকার শক্তি । আলো শক্তি আসে দেখে আমরা বস্তুকে দেখতে পাই । চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞান ( তড়িৎ চুম্বক তত্ত্ব )  এর মতে আলোক বিকিরণ অথবা শোষণ নিরবিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটতে পারে । যে কোন পদার্থের তিনটি ঘটনা ঘটতে পারে ; বিকিরণ, শোষণ ও প্রতিফলন।  জার্মান পদার্থবিদ গুস্তাভ কার্শফ 1859 সালে প্রমাণ করে দেখান যে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সকল বস্তুর শোষণ ক্ষমতা ও বিকিরণ ক্ষমতা সমান । অর্থাৎ বস্তু যে পরিমাণ শোষণ করবে সে পরিমাণ বিকিরণ করবে । বিকিরণ বা শোষণ যাই হোক না কেন চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানে তত্ত্ব অনুসারে শক্তি সব সময় নিরবিচ্ছিন্ন থাকবে।  অর্থাৎ গতিশক্তি থেকে শব্দ শক্তি অথবা তাপ শক্তি যাই হোক না কেন ভগ্নাংশ হতে পারে । কারশফের সূত্র কি হলো ,” বস্তুর উপর নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় বিকিরণ ও শোষণ অনুপাত সমান “।  অর্থাৎ যে বস্তু যত বেশি শোষণ করবে সেই বস্তু তত বেশি বিকিরণ করবে । বিজ্ঞানীরা লক্ষ করলেন কালো রঙের বস্তুর শোষণ ক্ষমতা এবং বিকিরণ ক্ষমতা বেশি এবং কালো বস্তু সর্বোচ্চ বিকিরণ বিকিরণ করে । কালো বস্তু গুলো অনেকটা কৃষ্ণবস্তুর মত আচরণ করে । কয়লা ও এক ধরনের কৃষ্ণবস্তু কিন্তু কয়লা 100% কৃষ্ণবস্তু নয় । বাচ্চাদের কপালে যে কালো টিপ দেওয়া হয় সেটাও এক ধরনের কৃষ্ণবস্তু ।  একটা আদর্শ কৃষ্ণবস্তু 100% শোষণ করবে কিন্তু বাস্তবে এমন কোন আদর্শ কৃষ্ণবস্তু নেই যে 100% শোষণ করে । প্রশ্ন হল যে কৃষ্ণবস্তু শোষণ করবে কেন ? শুধুমাত্র কৃষ্ণবস্তু নয় সমস্ত বস্তুই শোষণ করবে । সকল বস্তুতেই শোষণ ও প্রতিফলন ঘটে । কিন্তু কৃষ্ণ বস্তুতে শুধুমাত্র শোষণ ঘটে কোনো প্রতিফলন ঘটে না । সাদা আলো হলো সব রঙের মিশ্রণ তাই সেটা সাদা দেখায় । বস্তুর  রং বলতে বোঝায় প্রতিফলিত তরঙ্গ দৈর্ঘ্য । কোনো বস্তু লাল যার অর্থ লাল আলোক তরঙ্গ বাদে সব আলো শোষণ করে । বস্তু নীল হলে সেখান থেকে নীল বাদে সব আলো শোষণ করেছে । কালো হলে সব আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য শোষণ করেছে কোনো প্রতিফলত নেই । কালো বস্তুর বিশেষ বৈশিষ্ট্য শোষণ ক্ষমতা বেশি । কিন্তু 100 ভাগ শোষণ কোন বস্তু করা পারে না ।

এখন একটা আদর্শ কৃষ্ণবস্তু দরকার যা সমস্ত আলো শোষণ করতে পারে । 1995 সালে আদর্শ কৃষ্ণবস্তু বানাতে সক্ষম হোন ।  বিজ্ঞানীরা ।একটি গোলক তৈরি করেন যার ভিতরে ফাঁপা । ফাঁপা গোলকের উপর একটি ছিদ্র রাখা হয় তাপশক্তি প্রবেশের জন্য । ফাঁপা গোলকের অভ্যন্তরে প্রবেশিত তাপশক্তি গোলকের ভিতরে পৃষ্ঠে প্রতিফলিত হতে হতে একসময় গোলক সমস্ত শক্তি শোষণ করবে । শুধু শোষণ করলে হবে না তা আবার বিকিরণ করতে হবে । 

কৃষ্ণবস্তু কতটা তাপ কতটুকু শক্তি বিকিরণ করবে সেটার একটা সূত্র প্রদান করা হলো ।

                    E= kt²

 এই পর্যন্ত সব ঠিকঠাক চলতেছিল । তখনকার সবাই ধরে নিয়েছিল নিউটনের তিনটি সূত্র এবং তড়িৎ চুম্বক তত্ত্ব হাতে থাকলে পৃথিবীর এমন কোন সমস্যা নেই যার সমাধান করা যাবে না । এই ধারণা 1889 পূর্ব পর্যন্ত ছিলো । 1889 সালের পর কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ ব্যাখ্যার জন্য তাপ গতি বিদ্যা তত্ত্বের সাহায্যে জার্মান পদার্থবিদ উইলহেম ভীন  বিকিরণের সম্পর্কিত একটি সূত্র প্রদান করেন । যা ভীনেরে সূত্র নামে পরিচিত ।

সমস্যা হলো , কৃষ্ণবস্তু সব ধরনের আলো বিকিরণ করবে ।কিন্ত ভীনের সূত্র শুধুমাত্র হ্রসতর তরঙ্গের ক্ষেত্রে পরীক্ষালব্ধ ফলাফলের সাথে মিলে যায় 

ভীনের সূত্রের সমস্যা হলো বিকিরিত রশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্য কম হলে পরীক্ষালব্ধ ফলাফলের সাথে মিলে যায়( অর্থাৎ বিকিরণ কম্পাঙ্ক বেশি হলে ) কিন্তু তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বেশি (বিকিরণ কম্পাঙ্ক কম ) হলে আর পরীক্ষালব্ধ ফলাফলের সাথে মিলে না । এই সমস্যার জন্য 1900 সালের জুন মাসে রেলে – জিনস কৃষ্ণবস্তু বিকিরণ সম্পর্কিত আরেকটি সূত্র দেন । যা রেলে জিনস সূত্র নামে পরিচিত । এই সূত্র তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বেশি  হলে পরীক্ষালব্ধ ফলাফলের সাথে মিলে যায় । কিন্তু রেলে – জিনসের এর সূত্র কম তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের জন্য পরীক্ষালব্ধ ফলাফলের সাথে সাংঘর্ষিক । দুই সূত্র দুই দিকের কথা বলে । ভীনের সূত্র পরীক্ষালব্ধ ফলাফলের সাথে তখনই মিলে যখন আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য ছোট ( বিকিরণ কম্পাঙ্ক বেশি ) হলে আবার অপরদিকে  রেলে – জিনসের সূত্র পরীক্ষালব্ধ ফলাফলের সাথে তখনি মিলে যখন আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বড় (বিকিরণ কম্পাঙ্ক কম ) হবে । কিন্তু মাঝের অংশে কী ঘটে দুইটা সূত্রের একটিও তা ব্যাখ্যা করতে পারে না ।। ম্যাক্সওয়েলের তড়িৎ চুম্বক তত্ত্ব দ্বারা এইসব সমস্যার ব্যাখ্যা করা যায় না । এখানে চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের ব্যর্থতা । পরে জার্মান পদার্থবিদ ম্যাক্সপ্লাঙ্ক তার কোয়ান্টাম তত্ত্ব দ্বারা এই সমস্যার সমাধান করেন । 

1900 খ্রিস্টাব্দে 19 অক্টোবর ম্যাক্সপ্লাঙ্ক এগিয়ে আসলেন এবং কৃষ্ণবস্তুর সমস্যার সমাধান করলেন । প্লাঙ্ক তত্ত্বের সারকথা হলো ,” বিকিরিত শক্তি নিরবিচ্ছিন্ন নয় তা বিচ্ছিন্ন বা প্যাকেট প্যাকেট আকারে বের হয় ” । কৃষ্ণবস্তু থেকে যে শক্তি নির্গত হয় তা “কোয়ান্টা ” বা “প্যাকেট” আকারে বের হয় । আর এখানে থেকেই কোয়ান্টাম নামের অভির্ভাব ।  আপনার ঘরে যে সাদা লাইট আছে , আকাশে সূর্য ইত্যাদি সবকিছুর আলো আসলে কোয়ান্টা বা প্যাকেট হিসাবে বের হয়  । যদি লক্ষ করেন তাহলে দেখছেন ,  পানির ট্যাপ থেকে যখন পানি পড়ে তখন প্রথমদিকে পানির ধারাকে নিরবিচ্ছিন্ন মনে হয় । যখন চাবি ঘুরিয়ে পানির গতিকে দমন করার চেষ্টা করা হয় তখন পানির ধারা একটি রশ্মি আকারে বেরিয়ে আসে যেন পুরো পানিটা একটি রশ্মি আকারে বেরিয়ে আসছে । এইভাবে ট্যাপের চাবিকে আরো ঘোরালে সর্বশেষ একই আকারের পানির ফোটা পর্যায়ক্রমে একই সময় পরপর একটির পর একটি পড়তে থাকে । এরপর ট্যাপের চাবি যত ঘুরানো হোক না কেন পানির পরিমাণ একটা থেকে কমে কখনো আধা বা দশ ভাগের এক ভাগ ইত্যাদি হয় না 

আলো নিরবিচ্ছিন্ন কেন দেখি ?

আমাদের মস্তিষ্কে দৃষ্টিশক্তির ধারণক্ষমতার একটা সীমা আছে যে কারণে আমরা আলোকে নিরবিচ্ছিন্ন মনে করি । 0.1 এর মধ্যে পর পর কয়েকটি স্থির ছবি আসলে আমরা দুইটা স্থির ছবিকে আলাদা করতে পারি না । আলোর বেগ অনেক বেশি তখন পর পর দুইটা প্যাকেট আসলে আমরা আলাদা করতে পারি না । 

ম্যাক্স প্লাঙ্ক হিসাব করলেন প্যাকেটের সাইজের সাথে প্যাকেটের সংখ্যার একটা সম্পর্ক আছে । প্যাকেটের সাইজ ছোট হলে প্যাকেট সংখ্যা অনেক সংখ্যক থাকতে পারে কিন্তু প্যাকেটের সাইজ বড় হলে প্যাকেট সংখ্যা কমে যায় । সাইজ বাড়তে বাড়তে প্যাকেট সংখ্যার যোগফল নিয়ে বেড়ে শক্তি সর্বোচ্চ হয় । কিন্তু সাইজ বাড়ার সাথে সাথে শক্তির প্যাকেটের সংখ্যা কমে যায় তখন আবার সব প্যাকেটের শক্তির যোগফল সর্বোচ্চ শক্তি থেকে কমা শুরু করে । 

ε = 1ε1 + 2ε2 + 3ε3 + 4ε4 +….nεn

সুতরাং E=∑hv 

এখানে যেহেতু সংখ্যা গুলো পূর্ণ সংখ্যা নির্দিষ্ট তাই শক্তিও নির্দিষ্ট ” কোয়ান্টা ” এখান থেকে কোয়ান্টাম তত্বের সূচনা । ম্যাক্স প্লাঙ্ক এর সূত্রটা ভীনের সূত্র ও রেলি জিন্সের সূত্রকে সমর্থন করে । 

[1] নিশ্চয়তা নীতি কোয়ান্টাম বলবিদ্যা- মোহাম্মদ ইয়াছিন

[2] কোয়ান্টাম ফিজিক্স – আব্দুল গাফফার রনি 

[3] চা কফি কোয়ান্টাম – নাঈম হোসেন ফারুকী

[5] কণা কোয়ান্টাম – রেজা এলিয়ান

[4] কোয়ান্টাম মেকানিক্স ১ ও 2 – এস . চৌধুরী

[5]কণা কোয়ান্টাম – রেজা এলিয়ান 

[6] বিজ্ঞানসমগ্র – এ.এম.হারুন অর রশীদ

[7] তাপ ও তাপগতিবিদ্যা – নীলফুর আখতার 

[8] পদার্থবিজ্ঞানের অনিশ্চয়তা – YouTube channel- বোধিচিত্ত

[9] মাক্স প্লাংক – উইকিপিডিয়া

[10]https://www.researchgate.net/publication/315112016_Planck’s_radiation_law_the_light_quantum_and_the_prehistory_of_indistinguishability_in_the_teaching_of_quantum_mechanics

[11]https://courses.lumenlearning.com/introchem/chapter/plancks-quantum-theory/#:~:text=Planck%20postulated%20that%20the%20energy,quanta%20of%20energy%2C%20or%20photons.

One thought on “ম্যাক্স প্লাঙ্কের কোয়ান্টাম তত্ব ও চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের ব্যর্থতা ।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *