দর্শন ও কোয়ান্টাম মেকানিক্স - YMC
Thu. Jul 7th, 2022
YMC

মানুষের আবেগ কখনো বিজ্ঞানের অংশ হতে পারে না । যেমন ধরুন আমি বেঁচে আছি বলে পৃথিবী সুন্দর এবং আমি মারা গেলে পৃথিবীর সৌন্দর্য শেষ হয়ে যাবে । সৌন্দর্য মানুষের আবেগের অংশ । সৌন্দর্য কোনো পরিমাপ বা দিক নেই । কেউ দাবি করতে পারবে না সৌন্দর্য পূর্ব দিকে থাকে ! সৌন্দর্য এর সংজ্ঞা একেক জনের কাছে একেক রকম । তাই সৌন্দর্য আর যাই হোক না কেন  বিজ্ঞান হতে পারে না । এটি মনোবিজ্ঞান বা দর্শনের একটি অংশ ।  । বিজ্ঞান এবং দর্শন সম্পূর্ণ আলাদা দু’টি বিষয় । কিন্তু কোয়ান্টাম  মেকানিক্সে এসে আবেগ-অনুভূতিকে বিজ্ঞানে স্থান দিয়েছে । 

2

ইলেকট্রন কণা নাকি তরঙ্গ ? 

হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি বলে , ” ইলেকট্রন একই সাথে কনা এবং তরঙ্গ ” । ইলেকট্রন কণা নাকি তরঙ্গ সেটা নির্ভর করবে আপনার উপর । অর্থাৎ ইলেকট্রনকে আপনি যেভাবে দেখতে চাবেন ইলেকট্রন সেভাবে আপনার কাছে ধরা দিবে ! আপনি যদি চান ইলেকট্রনের তরঙ্গ ধর্ম আপনার সামনে প্রদর্শিত হোক তাহলে আপনি ইলেকট্রনের তরঙ্গ ধর্ম দেখতে পাবেন । ইলেকট্রনের তরঙ্গ ধর্ম দেখতে হলে আপনাকে তরঙ্গ ডিটেক্টর লাগাতে হবে । তরঙ্গ ডিটেক্টরের কাজ হলো ইলেকট্রনের শুধুমাত্র তরঙ্গ ধর্ম প্রদর্শন করা । যদি আপনি চান ইলেকট্রন কণা হিসেবে আপনার সামনে ধরা দিক তাহলে ইলেকট্রনকে আপনি কণা হিসাবেই দেখবেন । ইলেকট্রনের কণা বৈশিষ্ট্য প্রদর্শনের জন্য আপনাকে কণা ডিটেক্টর বসাতে হবে । কনা ডিটেক্টরের কাজ হলো ইলেকট্রনের শুধুমাত্র কনা ধর্ম বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করা । ইলেকট্রন কণা হবে নাকি   তরঙ্গ হবে সেটা নির্ভর করবে আপনার অনুভূতির উপর । আপনি না চাইলে ইলেকট্রনেরকে কখনো কণা হিসাবে দেখবেন না । আবার আপনি না চাইলে ইলেকট্রনকে তরঙ্গ হিসেবে দেখবেন না । কারণ আপনার অনুভূতি কণা ধর্মের প্রতি থাকলে আপনি কণা ডিটেক্টর লাগাবেন আবার আপনার অনূভুতি তরঙ্গ ধর্মের প্রতি থাকলে আপনি তরঙ্গ ডিটেক্টর লাগাবেন ।

 এখন প্রশ্ন হলো , যদি আপনার কোনো অনুভূতি না থাকে তাহলে ইলেকট্রন আসলে কি ? এই যে বললাম হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি বলে , ইলেকট্রন একই সাথে কণা  ও তরঙ্গ । কিন্তু প্রশ্ন ছিল , আমার কণা বা তরঙ্গের কোনোটার প্রতি অনুভূতি নেই তাহলে ইলেকট্রন কি ? 

ব্যাপারটা দাঁড়াল কোথায় ! আইনস্টাইনের ইলেকট্রনের কণাধর্মের প্রতি অনুভূতি ছিল তাই তড়িৎ ক্রিয়া ইলেকট্রন কণা হিসেবে ধরা দিয়েছে । ডেভিসন ও জে . পি টমসনের ইলেকট্রনের তরঙ্গ ধর্মের প্রতি অনুভূতি ছিল তাই দ্বিচির পরীক্ষায় ইলেকট্রন তরঙ্গ হিসেবে ধরা দিয়েছে । আবার দ্য ব্রগিলির ইলেকট্রনের কনা ও তরঙ্গ দুইটার  প্রতি অনুভূতি ছিল তাই ব্রগিলির সামনে ইলেকট্রন দ্বৈত ধর্ম হিসাবে ধরা দিয়েছে । 

একটা সময় ফিজিক্স আর দর্শন অভিন্ন ছিল । দর্শনের যুক্তি দিয়ে যেটা প্রমাণ করা যায় সেটাকে সঠিক বলে বিবেচনা করা হতো । তার জন্য আলাদা কোনো সমীকরণের প্রয়োজন ছিল না । শুধুমাত্র মুক্তি থাকলেই যথেষ্ট ছিল । প্রাচীন যুগে বিখ্যাত দার্শনিক অ্যারিস্টোটল বলতো ,” seeing is believing ” তার কথার মূল ভাব ছিল , আপনি যা চোখ দিয়ে দেখবেন তা বিশ্বাস করবেন । আর যা দেখবেন না তা বিশ্বাস করার কোনো প্রয়োজন নেই । তার উক্ত বক্তব্যের জন্য দর্শন এগিয়ে গেলেও বিজ্ঞান পিছিয়ে পড়ে । একটি পাখির পালক এবং একটি পাথরের টুকরো একই সাথে একই উচ্চতা থেকে পড়া শুরু করলে পালকের থেকে পাথরটি ভূমিতে আগেই পড়বে , “seeing is believing ” উক্তি অনুযায়ী এটা সত্য কিন্তু বিজ্ঞানের মতে এটা মারাত্মক ভুল । কারণ যা চোখে দেখা যায় না যেমন বাতাস পালককে বাধা দেয় । যখন পরীক্ষালব্ধ বিজ্ঞানের নিয়ম প্রচলিত হলো তখন থেকে দর্শন আর বিজ্ঞান দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় । দর্শনে শুধু যুক্তি থাকলেই হবে , তার জন্য কোনো প্রমাণের প্রয়োজন নেই । কিন্তু বিজ্ঞানে মানুষের আবেগের স্থান শূন্য । কারণ আবেগগুলো কখনো প্রমাণ করা যায় না এবং একেকজনের আবেগ একেক রকম । তাই বিজ্ঞানে মানুষের আবেগকে স্থান দেয় নি ।

আপনি গহিন  জঙ্গলে গিয়েছেন  । এমতাবস্থায় জঙ্গলে একটি গাছ ভেঙ্গে গেলো । আপনি ভেঙ্গে যাবার শব্দ শুনছেন , নিজের চোখ দিয়ে গাছটা ভেঙেছে তা দেখছেন তাই আপনি নিশ্চিত গাছটি ভেঙ্গেছে  । আর যদি আপনি জঙ্গলে না যেতেন তাহলে গাছটি ভাঙ্গার শব্দ না শুনলে , নিজের চোখ দিয়ে না দেখলে গাছটি কি ভাঙতো না ? 

দার্শনিকদের মতে আপনি কোনো জঙ্গলে যাননি , গাছ ভাঙ্গার শব্দ শুনেন নাই , গাছ ভাঙার দৃশ্য দেখেন নাই , অতএব গাছ ভাঙ্গে নাই । অর্থাৎ আপনি যদি জঙ্গলে যেতেন তাহলে কাছটি ভাঙতো । আপনি জঙ্গলে যান নেই তাই গাছ ভাঙ্গে নাই । আসলে কি তাই ! আপনার জঙ্গলে যাওয়া না যাওয়ার   উপর নির্ভর করবে গাছের ভবিষ্যৎ ? ঠিক এই কারনে ফিজিক্স   আর দর্শন সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যায় ।   কিন্তু কোয়ান্টাম মেকানিক্স  পদার্থবিজ্ঞান ও  দর্শনকে পুনরায়  একত্র করেছে । 

দ্বিচির পরীক্ষায় কোনো ডিটেক্টর না বসালে ইলেকট্রনের তরঙ্গ ধর্ম প্রদর্শন করবে । আর যদি ডিটেক্টর বসান তাহলে ইলেকট্রন কনা ধর্ম প্রদর্শন করবে । আপনি ডিটেক্টর বসিয়েছেন তাই ইলেকট্রন কণা হিসেবে ধরা দিয়েছে । ইলেকট্রনের অবস্থান জানার জন্য , ইলেকট্রনকে দেখার জন্য আপনি ডিটেক্টর বসিয়েছেন তাই ইলেকট্রন কনা হিসাবে ধরা দিয়েছে । ইলেকট্রনের অবস্থান জানার জন্য , ইলেকট্রনকে দেখার জন্য আপনি ডিটেক্টর বসিয়েছেন  তাই ইলেকট্রন কণা হয়ে প্রদর্শন করবে । আপনি দেখতে চাইছেন তাই ইলেকট্রন কণা ধর্ম প্রদর্শন করছে । আপনি না চাইলে ইলেকট্রন কখনো কনা ধর্ম প্রদর্শন করত না । 

যখন আপনি পর্যবেক্ষণ করবেন
যখন আপনি পর্যবেক্ষণ করবেন না

এই কথা শুনে আইনস্টাইনের রেগে গিয়ে বলেছিলেন ,” আচ্ছা আমি যদি না তাকাই তাহলে কি আকাশে চাঁদটাও থাকে না ” 

বর্তমান কোয়ান্টাম মেকানিক্স অনুযায়ী , আপনি আকাশে না তাকালে আকাশে চাঁদ থাকে না । আপনি তাকাচ্ছেন তাই চাঁদ দেখছেন ! 

“এই পৃথিবী খুবই সুন্দর , আমি বেঁচে আছি তাই এতো সুন্দর  ।  যেদিন আমি মারা যাবো সেদিন এই সৌন্দর্য থাকবে না । এই সুন্দর পৃথিবী গায়েব হয়ে যাবে ” । সত্যিই আমি মারা যাওয়ার পর এই সৌন্দর্য্য থাকবে না ? আমি মারা যাবার সাথে  পৃথিবীর সৌন্দর্য  কি সম্পর্কে ? আইনস্টাইন বললে কি সমস্যা ছিলো ? আইনস্টাইন যদি এই উক্তিটি বলতো তাহলে কি আজকে পৃথিবীর সৌন্দর্য থাকতো না ? 

Leave a Reply

Your email address will not be published.